পবিত্র কোরআন
থেকে বিষয়ভিত্তিক আলোচনা
(২য় খন্ড)

মুখবন্ধ

প্রচলিত ধর্মবিশ্বাস, তথ্যপ্রযুক্তি ও বিজ্ঞান ভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গির দ্বারা প্রশ্নবিদ্ধ। আজকের যুগের মানুষ সবকিছুরই স্পষ্ট দলিল চায়। দ্বীনের ক্ষেত্রে কোরআনই স্পষ্ট দলিল (জাছিয়া, ২০ আয়াত) (রাদ, ৩৭ আয়াত)। পবিত্র কোরআনই সত্য মিথ্যার পার্থক্যকারী (বাকারা, ১৮৫ আয়াত)। কোরআনই দ্বীনের পরিপূর্ণ দলিল (মায়েদা, ৩ আয়াত)। আর নবী (সাঃ) এর জন্য আল্লাহ্ বিধান স্বরূপ এই কোরানই পাঠিয়েছেন (২৮ ঃ ৮৫)। একটি বিষয়ে বিভিন্নভাবে এই কোরআনে আল্লাহ বর্ণনা করেন। যাতে তারা বুঝতে পারে (আনআম, ৬৫ আয়াত)। তাই একটি বিষয়কে সঠিকভাবে বুঝে নেওয়ার জন্য কোরআন থেকে বিষয়ভিত্তিক আলোচনা করা হয়েছে। যাতে করে প্রত্যেক মানুষ স্বল্প সময়ে তার প্রয়োজনীয় বিষয়ে কোরআনভিত্তিক জ্ঞান সহজেই লাভ করতে পারে। তারপরও যদি কেউ কোরআনের দর্শনকে অপছন্দ করেন তাদের জন্য আল্লাহ বলেন, যারা এই কোরআনের আয়াতের বুঝ অপছন্দ করে তাদের কর্মফল বিনষ্ট হয়। (মোহাম্মদ, ৯ আয়াত)। কোরআন প্রত্যাখ্যানকারীর জন্য কঠিন শাস্তি, (সাফফাত, আয়াত ১৭০)। কোরআন প্রত্যাখ্যানকারী ফাসিক, (বাকারা, আয়াত ৯৯)। বরং সেই দিবস আসার পূর্বেই প্রভুর আহ্বানে সাড়া দাও (শুরা, আয়াত ৪৭)। যারা কোরআনের বুঝ অপছন্দ করেন তারা দলিলবিহীন তর্ক করে থাকেন। এই মর্মে আল্লাহ বলেন, "তোমরা মানুষকে প্রভুর পথে আহ্বান কর হিকমতের সদউপদেশ দ্বারা এবং তাদের সহিত তর্ক কর উত্তম পন্থায়" (নহল, ১২৫ আয়াত)। ইবলিস আদমকে সেজদা না দিয়েই কাফির। (সূরা বাকারা, ৩৪ আয়াত) এতে প্রমাণ হয় যে, আদম কাবাই আল্লাহকে সেজদা না দেওয়া ইবলিসের দর্শন। অর্থাৎ আদম কাবাই আল্লাহকে সেজদা করাই হচ্ছে সিরাতাল মুস্তাকীম, যা আমা পর্যন্ত পৌঁছে (সূরা হিজর, ৪১ আয়াত)। অর্থাৎ আদম কাবাই আল্লাহকে সেজদা করার মাধ্যমে আল্লাহর নিকটবর্তী হওয়া যায়। এবং এই সেজদা না করা ইবলিসের অনুসরণ করার সামিল। এই মর্মে আল্লাহ বলেন, "তোমরা ইবলিসের অনুসরণ করো না এখানে সেজদা কর এবং আমার নিকটবর্তী হয়ে যাও"। (সূরা আলাক, ১৯ আয়াত)। "ইবলিস এই সেজদা না করেই পথভ্রষ্ট।" পক্ষান্তরে ফেরেস্তারা আদমকাবাই সেজদা করেই হেদায়েতপ্রাপ্ত।] 'ইহা দ্বারা অধিকাংশ মানুষ পথভ্রষ্ট এবং ইহা দ্বারাই অধিকাংশ মানুষ হেদায়েতপ্রাপ্ত। (বাকারা, ২৬ আয়াত)। ইবলিস আল্লাহর প্রতিপক্ষ, ইবলিসের বুঝকে বর্জন করে আদম কাবাই আল্লাহকে সেজদার দিকে আহ্বান করাই হচ্ছে এই পুস্তকের বিশেষ লক্ষ্য। যারা (আদম কাবাই আল্লাহকে সেজদার এই) আহ্বানে সাড়া না দিয়ে ইবলিসের দিকে রয়ে গেল তারাই বিভ্রান্ততে আছে। আল্লাহর দিকে আহ্বানকারীর ডাকে যে সাড়া না দেয় সে স্পষ্ট বিভ্রান্তিতে আছে (আহকাফ, ৩২ আয়াত)। আর আল্লাহর বিধানের কোনো পরিবর্তন নেই (বনি ইসরাইল, ৭৭) এবং আল্লাহর কোনো আয়াত রহিত করা হয় নেই। (বাকারা, ১০৬ আয়াত)। আর তাই বর্তমান বিশ্বে ধর্ম দর্শনের উত্তম পন্থাই হচ্ছে এই কোরআন যা সকল ধর্মের মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য। তাই কোরআন থেকে বিষয়ভিত্তিক আলোচনা পুস্তকটি সর্বসাধারণের জন্য ৩য় সংস্কার উপস্থাপন করলাম। পুস্তকের শাব্দিক ত্রুটি মার্জনীয়।

লেখক
মোঃ হাসিবুল হক চিশতি
এম.এ (আরবী), জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়,
এল.এল.বি (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়),
বি.এস.সি (রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়),
বি.এস.সি (সার্টিফিকেট কোর্স ভূগোল) জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।

পিতার নাম : সোনাউল্লা মন্ডল, মাতার নাম : মোছাঃ রাবেয়া খাতুন, সাং : কেদার নগর, পোঃ ও ইউনিয়ান : বেলগাছি, উপজেলা : আলমডাঙ্গা, জেলা : চুয়াডাঙ্গা, জন্ম তারিখ : ০৭ এপ্রিল, ১৯৬২ ইং।


সূচিপত্র

১. কোরআনই দ্বীনের পরিপূর্ণ দলিল

২. একত্ববাদের দ্বীন
৩. মানুষের মধ্যে আল্লাহর অবস্থান
৪. আল্লাহ সম্পর্কে দলিল ও কিতাববিহীনভাবে তর্ক করা যাবে না
৫. আল্লাহ গায়েব নন
৬. আল্লাহ লা-উরাই বা অদৃশ্য এমন আয়াত কোরআনে নেই
৭. আল্লাহর আকৃতি আছে ও তিনি প্রকাশ হতে সক্ষম
৮. ইহকালে আল্লাহর সাক্ষাত অসম্ভব এমন কথা কোরআনে নেই
৯. সেদিন আল্লাহ প্রকাশ হবে মানব সুরতে
১০. সেদিনের তাৎক্ষণিক বিশ্বাস কবুল করা হবে না এবং সেদিন তারা
আল্লাহর পায়ে সেজদাও দিতে পারবে না
১১. আল্লাহর সাক্ষাৎ অস্বীকারকারীর কর্মফল বিনষ্ট হবে এবং
তাদের জন্য সেদিন ওজনের কোনো ব্যবস্থা থাকবে না
১২. মানব আকৃতি বিশিষ্ট আল্লাহর পায়ে সেজদার মাধ্যমে
মৃত্যুর পর ঈমান পরীক্ষা করা হবে
১৩. আল্লাহর নিজ আকৃতিতে আদম তৈরি
১৪. মুছা (আ.) ও মোহাম্মদ (সা.) স্বরূপে আল্লাহ দর্শন করেছেন
১৫. প্রভুর দর্শন লাভ ও তার পক্ষ থেকে সাড়া পাওয়ার উপায় কী?
১৬. আল্লাহ সম্পর্কে তিনটি প্রশ্ন :
Who is the Allah? What is the Allah? Where is the Allah?
১৭. সম্যক গুরুর বৈশিষ্ট্য কি?
১৮. আল্লার অনুমতি ব্যতীত কেউ ইমান অর্জন করতে পারবে না
১৯. ইহকালে কল্যাণ চাইলে পরকালে শাস্তি
২০. অদেখা কোনকিছু স্মরণযোগ্য নয়
২১. আল্লাহ সম্পর্কে ধারণা বা অনুমান গ্রহণযোগ্য নয় এবং
আল্লার স্মরণে গাফেল ব্যক্তিরা ক্ষতিগ্রস্ত
২২. কাল্বের অবস্থান বাম স্তনের নীচে নয় বরং মস্তিষ্কে
২৩. আদম সেজদার রহস্য কি? ইবলিসের অনুসারী কে?
২৪. উসাল্লি ও সালাতের ভিতর পার্থক্য কী?
সালাত পড়ার কথা কোরআনে উল্লেখ নেই
২৫. আল্লাহর স্মরণে সেজদায় সালাত
২৬. প্রভুর কাছে আত্মসমর্পণ করার প্রক্রিয়া কী?
২৭. ইবলিসের সেজদা এবং মমিনদের সেজদার ভিতরে পার্থক্য কী?
২৮. আল্লাহর শায়ের বা চি‎হ্ন কি?
২৯. কিতাবিদের ও কাফেরদের আনুগত্য করো না
প্রয়োজনে বাসগৃহে সালাতের স্থান নির্ধারণ করো
৩০. আত্মিক কাবা হচ্ছে রসূল কাবা
৩১. পাঁচ ওয়াক্ত সালাত কায়েম করার কথা কোরআনে উল্লেখ নেই
৩২. রসূলের আনুগত্য করা ফরয
৩৩. রসূল ব্যবস্থা সার্বক্ষণিক
৩৪. প্রত্যেক নবীই রসুল কিন্তু প্রত্যেক রসুল নবী নহে এবং
নবী ও রসূলের মধ্যে পার্থক্য
৩৫. রসূলের কোনো বিকল্প নেই
৩৬. নবী শেষ কিন্তু রসূল শেষ এমন আয়াত কুরআনে উল্লেখ নেই
৩৭. সম্যক গুরুগণই রসূল
৩৮. গুরু নাম আল্লাহর একত্ববাদের নাম
৩৯. গুরু নাম আল্লাহর উত্তম গুণবাচক নাম
৪০. দুনিয়াবী ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাজে
নিয়োজিত ব্যক্তিদের আনুগত্য করা ফরজ
৪১. দ্বীনের ক্ষেত্রে তিন পন্থীরা বা তিন পন্থী পীরপন্থীরা শেরেকে গণ্য
৪২. জয় গুরু কেন বলি?
৪৩. কবরের আযাবের কথা কোরআনে উল্লেখ নেই
৪৪. ইসলামে জন্মান্তরবাদ
৪৫. বাদ্যযন্ত্র হারাম এ কথা কোরআনে উল্লেখ নেই
৪৬. দ্বীনের ক্ষেত্রে রসূলগণই একমাত্র ইমাম বা নেতা এবং আল্লাহর
অনুমতি সাপেক্ষে সেদিন রসূলগণই একমাত্র সুপারিশকারী
৪৭. আদম (আঃ)-এর ইবলিস মুক্তি
৪৮. রসূল তোমাদেরকে ইবলিসমুক্ত করে পবিত্র করবেন
৪৯. ইবলিশের অনুসারীদের ধর্ম বিভ্রান্তি থেকে আত্মরক্ষামূলক আলোচনা
আলোচনা নং-১ : আদমকাবায় সেজদা সম্পর্কে বিভ্রান্তি নিরসন।
আলোচনা-২ : আল্লাহ বিশ্বাস ও রসূল বিশ্বাস সম্পর্কে বিভ্রান্তি নিরসন
আলোচনা নং-৩ : আখিরাত বিশ্বাস সম্পর্কে বিভ্রান্তি নিরসন
আলোচনা নং-৪ ঃ সালাত সম্পর্কে বিভ্রান্তি নিরসন
৫০. ধর্ম নিরপেক্ষতা কুরআনের মতবাদ

কোরআনই দ্বীনের পরিপূর্ণ দলিল

পবিত্র এই কোরআনই শ্রেষ্ঠ জীবন দর্শন। আল্লাহ বলেন, "আমি যা নাযিল করেছি তদানুসারে যারা দ্বীনের বিষয়ে বিধান দেয় না তারাই কাফির (মায়েদা, ৪৪ আয়াত), আমি যা নাযিল করেছি তদানুসারে যারা দ্বীনের বিষয়ে বিধান দেয় না তারাই জালিম (মায়েদা, ৪৫ আয়াত), আমি যা নাযিল করেছি তদানুসারে যারা দ্বীনের বিষয়ে বিধান দেয় না তারাই ফাসিক (মায়েদা, ৪৭ আয়াত)। দ্বীনের সকল বিষয়ের মিমাংসা হবে এই কুরআনে। (তারিক-১৩)। কাজেই দ্বীনের ক্ষেত্রে ইজমা, কিয়াস, ফিকাহ শাস্ত্র, মানবরচিত গ্রন্থ ও হাদীস মোতাবেক কোনো বিধান দেয়া যাবে না। তারপরও যদি কেউ এমনটি বলেন যে, দ্বীনের যে সকল বিষয়ের ফয়সালা পবিত্র কোরআনের মধ্যে পাওয়া যাবে না, সে সকল বিষয়গুলো ইজমা, কিয়াস, ফিকাহ শাস্ত্র, মানবরচিত গ্রন্থ ও হাদিসের কিতাব দিয়ে সমাধান দিতে হবে। এমনটি যারা বলেন, তাদের কথায় প্রমাণিত হয় যে, এই কোরআন দ্বীনের বিষয়ে অপূর্ণ। কিন্তু না এই কোরআন দ্বীনের ক্ষেত্রে পরিপূর্ণ। কারণ সর্বশেষ অহীর মাধ্যমে আল্লাহ জানিয়ে দিয়েছেন, "আজকে তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দিলাম।" মায়েদা, ৩ আয়াত)। সত্য ও ন্যায়ের দিক থেকে আল্লাহর বাণী পরিপূর্ণ। আল্লাহর কথার কোন পরিবর্তন নাই (আনআম-১১৫)। তাই আল্লাহ বলেন, যদি তুমি অধিকাংশ মানুষের কথামতো চলো, তাহলে তারা তোমাকে আল্লাহর পথ হইতে বিচ্যুত করিবে (আনআম-১১৬)। কাজেই অধিকাংশ মানুষ নিশ্চয়ই আল্লাহর পথে নেই। কাজেই এই কোরআন দ্বীনের ক্ষেত্রে পরিপূর্ণ দলিল, এতে কোনো সন্দেহ নেই। দ্বীনের ক্ষেত্রে কোরআন ব্যতীত অন্য কোনো কিতাবের কোনো প্রয়োজন নেই। তারপর যদি কেউ বলেন যে, নবী মোহাম্মদ (স.) কে অনুসরণ করার ক্ষেত্রে হাদিসের অনুসরণ করা দরকার। তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলতে হচ্ছে যে, নবী মোহাম্মদ (স.) যা অনুসরণ করেছেন তা যারা অনুসরণ করেন তারাই নবী (স.)-এর অনুসারী। নবী মোহাম্মদ (স.)-কে আল্লাহ জানিয়ে দিয়েছেন যে, "হে নবী তোমার প্রতি যা অহী অবতীর্ণ হয় তুমি শুধু তারই অনুসরণ কর, অন্যকিছু অনুসরণ করো না।" আনআম আয়াত-৫০। কারণ নবী (স.) ওহি ব্যতীত কাউকে সতর্ক করেন নি। (আম্বিয়া- ৪৫) কাজেই যারা পবিত্র কোরআন সম্পূর্ণ ভাবে অনুসরণ করবে তারাই নবী (স.) এর অনুসারী, এতে কোনো সন্দেহ নেই। নবী (স.)কে অনুসরণের জন্য কোরআনের অনুসরণই যথেষ্ট, সেক্ষেত্রে হাদিসের অনুসরণের দরকার নেই। তারপরও যদি কেউ এমনটি বলেন যে, দ্বীনের ক্ষেত্রে এই কোরআনই যদি একমাত্র দলিল হয় তাহলে এত কিতাব-পুস্তক বাজারে কীভাবে এলো? তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলছি, আল্লাহ বলেন, "দুভোর্গ তাদের জন্য যারা নিজ হাতে কিতাব রচনা করে উহা আল্লাহর নামে চালিয়ে দেয় এবং স্বল্প মূল্যে বাজারে বিক্রি করে।" (বাকারা আয়াত ৭৯।)
এই কোরআন বাদে দ্বীনের ক্ষেত্রে যত কিতাব বাজারে এসেছে এগুলো সব মানুষের রচিত। এগুলো দ্বীনের কোনো দলিল নয় এগুলো পরিহারযোগ্য। এরপরও কিতাবিদের ভেতরে এমন অনেক লোক আছে যারা কোরআনের যে সকল আয়াতগুলোর অর্থ নিজেদের মতের বিরুদ্ধে যায়, যে সকল আয়াতগুলো সমাজে গোপন রাখে, জনসমাজে সেগুলো প্রকাশ করে না। এদেরকে সতর্ক করার জন্য আল্লাহ বলেন যে, "আমি আমার আয়াতসমূহ স্পষ্টভাবে কিতাবে ব্যক্ত করার পরও যারা সেগুলো গোপন করে তাদেরকে আল্লাহ অভিসম্পাত করেন বা লানত করেন।" বাকারা, ১৫৯ আয়াত। কাজেই কোরআনের কোনো আয়াত গোপন রাখা যাবে না। এরপরও কিছু লোক আছে যারা আয়াতের অর্থ এমনভাবে করে যে, যা এই কোরআনের অন্য আর একটি আয়াতের পরিপন্থী হয়ে যায়, সেক্ষেত্রে ঐ আয়াতটির উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয়। তাদের সতর্ক করার জন্য আল্লাহ বলেন, "যারা আমার আয়াতকে ব্যর্থ করার চেষ্টা করে তাদের জন্য কঠিন শাস্তি জাহান্নাম।" হজ, ৫১ আয়াত। অনেকেই কোরআনোর আয়াতকে বিকৃত করে ভিন্ন অর্থে নিয়ে যায়Ñ তাদের জন্য আল্লাহ বলেন, আমার আয়াত বিকৃতকারীর জন্য জাহান্নাম (৪১ ঃ ৪০) (২ ঃ ৭৫)। কাজেই নিজের মতো করে কোরআনের আয়াতের অর্থ করা যাবে না। বরং কোনো একটি বিষয়ের উপর কোরআনের সরল বুঝ লাভ করতে হলে ঐ বিষয়ের উপর যতগুলো আয়াত এই কোরআনে আছে সেই সকল আয়াতগুলোকে এক জায়গায় নিয়ে এসে অর্থ করলে কোরআনের সঠিক এবং সরল অর্থ পাওয়া যাবে। এজন্য কোরআন থেকে বিষয়ভিত্তিকভাবে আলোচনা করলে কোরআনের অপব্যাখ্যা থেকে মানুষ মুক্তি পাবে। সেক্ষেত্রে ইজমা, কিয়াস, ফিকাহ শাস্ত্র, মানবরচিত কিতাব ও হাদিসের কিতাবের উদ্ধৃতি দিয়ে কোরআনের ব্যাখ্যা করার দরকার নেই। তারপরও যারা কোরআন প্রত্যাখ্যান করবে তাদের জন্য শাস্তি (৩৭ ঃ ১৭০)। যারা এই কোরআনের দর্শন অপছন্দ করেন তাদের কর্মফল বিনষ্ট হবে। (৪৭ ঃ ৯)
আমাদের উচিত মানবরচিত গ্রন্থ ভিত্তিক দ্বীনের বুঝ পরিহার করে বিষয়ভিত্তিক কোরআনের মাধ্যমে দ্বীনের সঠিক বুঝ সমাজে প্রতিষ্ঠিত করা।

একত্ববাদের দ্বীন

দ্বীনের বিষয়ে সকল কিছু একমাত্র আল্লাহর প্রাপ্য। (জুমার ঃ ৩ আয়াত)। কাজেই দ্বীনের বিষয়ে কাউকে আল্লাহর সাথে শরিক করা যাবে না অর্থাৎ দ্বীনের বিষয়ে কোনো ভাগাভাগি করা যাবে না। একত্ববাদে দ্বীন আর দ্বিতত্ত্বে শেরেক। এই কথাটা মাথায় রেখেই আমাদের দ্বীনের সকল কাজ করতে হবে। কিন্তু একত্ববাদে থাকতে গিয়ে যদি কেউ রসূলকে বাদ দিয়ে শুধু আল্লাহকেই ডাকে তাহলে সে ইবলিসের অনুসারী কাফের হবে কারণ ইবলিসও আল্লাহকে প্রভু বলে ডাকে। (হিজর ঃ ৩৬ আয়াত)। কিন্তু ইবলিস রসূলের আনুগত্য না করেই কাফের (বাকারা ঃ ৩৪ আয়াত)। তাহলে দেখা গেল রসূলকে কোনো অবস্থায় বাদ দেয়া যাবে না। তাহলে অবশ্যই রসূলকে রাখতে হবে কিন্তু যখন রসূলকে নেয়া হবে তখন দ্বীনের দৃষ্টিভঙ্গি দুই দিকে চলে যাবে আর দুই দিকে গেলেই দুই তত্ত্ব গণ্য হবে ফলে দ্বীনের বিষয়ে শেরেক হবে এজন্য আল্লাহ এ বিষয়ে সতর্ক করে বলেন যে, তোমরা কোনো অবস্থায় আল্লাহর সাথে কাউকে ডেকো না (জিন, ১৮ আয়াত)। দেখা গেল রসূলকে বাদ দিলে কাফের আবার আল্লাহর সাথে ডাকলেও শেরেক। এজন্য আল্লাহ শেরেকের বিষয়ে সতর্ক করে বলেন 'শেরেক হচ্ছে সবচেয়ে বড় জুলুম' (লুকমান, ১৩ আয়াত)। আল্লাহ বলেন, তোমাদের ইমানকে জুলুম দ্বারা কলুষিত করোনা (আনআম, ৮২ আয়াত)। কাজেই কোনো অবস্থায় শেরেক হলে ইমান কলুষিত হবে। শেরেকের অপরাধ ক্ষমা করা হবে না (নেছা, ৪৮ আয়াত)। শেরেক করলে কর্মফল বিনষ্ট হবে। (জুমার, ৬৫ আয়াত)। এখন যদি কেউ শেরেক এড়ানোর জন্য অর্থাৎ একত্ববাদে থাকার উদ্দেশ্যে আল্লাহকে বাদ দিয়ে শুধু রসূলকে ডাকেÑ এই মর্মে আল্লাহ বলেন, আল্লাহকে বাদ দিয়ে তোমরা কাউকে ডেকো না। (ইউনুস, ১০৬ আয়াত)। আবার আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্য কাউকে আল্লাহকে পাওয়ার জন্য ডাকা যাবে না। এ বিষয়ে আয়াতে আসছে আল্লাহকে বাদ দিয়ে তারা অন্যকে অভিভাবক হিসেবে একজন্য অর্চনা করে যে, তারা তাকে আল্লাহর সান্নিধ্যে এনে দেবে তারাও কাফের। (জুমার ঃ ৩ আয়াত)। কাজেই আল্লাহ প্রাপ্তির আশায় আল্লাহকে বাদ দিয়ে শুধু রসূলকে ডাকারও কোনো সুযোগ নেই। কাজেই কোনো অবস্থায় আল্লাহকে বাদ দিয়ে কোনো কিছুই দ্বীনের বিষয়ে গ্রহণযোগ্য নয়। কেউ এমনটি করলে আল্লাহকে অস্বীকার করার সামিল হবে। আর আল্লাহকে অস্বীকার করলে তার কর্মফল বিনষ্ট হবে। (ইব্রাহিম, ১৮)। তাহলে সমস্যাটা এমন যে, আল্লাহকে বাদ দিলেও কাফের আবার রসূলকে বাদ দিলেও কাফের। আবার আল্লাহর সাথে রসূলকে ডাকলেও শেরেক। তাহলে এই সমস্যাটার সমাধান পবিত্র কোরআন থেকেই করতে হবে। এ বিষয়ে আল্লাহ বলেন, 'আমি যা নাজিল করেছি সেই মোতাবেক তোমরা রাসূলের আনুগত্য করবে এজন্য আমি রসূল পাঠাই।' (নেছা, ৬৪ আয়াত)। এ বিষয়ে আল্লাহ বলেন, 'তোমরা যখন রসূলের কাছে যাবে তখন তো আল্লাহর কাছেই গেলে। যখন রসূলের কাছে বাইয়াত গ্রহণ করলে তখন তোমাদের দৃষ্টিভঙ্গি থাকবে, আমি তো আল্লাহর কাছেই বাইয়াত গ্রহণ করেছি। আল্লাহর হাত তাদের হাতের উপর (৪৮ ঃ ১০) (আল ফাতাহ, ১০ আয়াত)। এইভাবে যখন তুমি রসূলের আনুগত্য করবে তখন তো সেই আনুগত্য আল্লাহরই হবে (নেছা, ৮০ আয়াত)। তাহলে দেখা যাচ্ছে রসূলের কাছে গিয়ে রসূল জ্ঞানে আনুগত্য করাÑ এটা মনগড়া মত হচ্ছে বিধায় এটা শেরেক হচ্ছে। অথচ আল্লাহর নির্দেশ হচ্ছে রাসূলের মধ্যে আল্লাহর অবস্থান আছে, রসূলকে ফানা করে রসূল সুরতে আল্লাহকে আনুগত্য করতে হবে। রসূলের মধ্যে আল্লাহর অবস্থান আছে (ক্বাফ, ১৬ আয়াত)। এই আয়াতে আল্লাহ বলেন, 'আমি মানুষের গর্দানের ধমনি অপেক্ষাও অতি নিকটে আছি।' অর্থাৎ রসূলের মধ্যে স্বয়ং আল্লাহ সক্রিয় আছেন (৮ ঃ ১৭)। এখানে আল্লাহ রসুলের সাথে আছেন (হাদিদ-৪)। তাই রসূলের হাত যখন আল্লাহর হাত, তখন রসূলের পা আল্লাহর পা। রসূলের চেহারার মধ্যে রসূলকে বিলীন করে সেই সুরতে আল্লাহ বিশ্বাস করে আদম কাবায় আল্লাহকে সেজদা দেওয়া। এটাই হচ্ছে একত্ববাদের দ্বীন। এখানে রসূলকেও বাদ দেয়া হয় নি, আল্লাহকেও বাদ দেয়া হয় নি। আবার দ্বীনের দৃষ্টিভঙ্গি দুই দিকেও যায় নি বিধায় শেরেক হয় নি। তাই একত্ববাদের দ্বীনে পৌছাতে হলে আমাদের রসূলের হাতে বাইয়াত হওয়া দরকার। এজন্য অবশ্যই আমাদের রসূল দরকার। রসূল সূরতে আল্লাহকে সেজদা না দিলে আমরা ইবলিশ থেকে পবিত্র হতে পারব না। রসূল ছুরতে আল্লাহকে সেজদা দেওয়াই ইবলিশ মুক্তির একমাত্র উপায়। কারণ ইবশিল কখনো আদম সেজদায় শামিল হবে না। (হিযর-৩৩)। রসূল না হলে আমরা পবিত্র হতে পারব না। (বাকারা, ১৫১ আয়াত)। এইজন্য আমাদের মধ্যে রসূল উপস্থিত থাকার প্রয়োজন। এ বিষয়ে আল্লাহ বলেন, 'মমিনদের মধ্য থেকে মমিনদের কাছে আমি রসূল পাঠাই। (ইমরান, ১৬৪ আয়াত)। পবিত্র কোরআন দর্শনে রসূল সন্ধান করে সেই রসূলের কাছে উপরিউক্ত প্রক্রিয়ায় আনুগত্যের বাইয়াত গ্রহণের মাধ্যমে একত্ববাদের দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত করা দরকার। এ বিষয়ে আল্লাহ বলেন, 'তোমরা তোমাদের দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত কর।' (সূরা, শুরা ১৩ আয়াত)। যারা রসূল থেকে দূরে আছে তারা একত্ববাদের দ্বীন থেকে সরে আছে। একত্ববাদের দ্বীনই হচ্ছে আল্লাহর মনোনীত দ্বীন (ইমরান, ৮৫)। যারা এই একত্ববাদের দ্বীন থেকে ফিরে গেল তাদের ইমান কোনো কাজে আসবে না (আনআম, আয়াত ঃ ১৫৯)। যারা এই একত্ববাদের দ্বীন থেকে ফিরে গেল এবং কাফের অবস্থায় মৃত্যুবরণ করলো তাদের কর্মফল বিনষ্ট হবে। (বাকারা, আয়াত ঃ ২১৭)। যারা এই একত্ববাদের দ্বীনকে বিভক্ত করল তারা বিভ্রান্তিতে আছে। (রুম, ৩২ আয়াত)। যারা এই একত্ববাদের দ্বীনকে মিথ্যা সাব্যস্ত করলো তাদের সালাত কোনো কাজে আসবে না। (মাউন, আয়াত ৬) যারা এই একাত্ববাদের দ্বীন থেকে ফিরে গেল তাদেরকে সরিয়ে দিয়ে এমন এক জাতীয়কে সেই স্থলে এনে দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত করবে যারা শুধু আল্লাহকেই ভালোবাসে আর আল্লাহ তাদেরকে ভালোবাসে' (মায়েদা, ৫৪ আয়াত)। যারা এই একত্ববাদের দ্বীনে বাঁধা দেয় তাদের মৃত্যু হবে যন্ত্রণাদায়ক (আনফাল, ৪৯ আয়াত)।
একত্ববাদের দ্বীনে প্রতিষ্ঠিত থাকাই মানব মুক্তির একমাত্র পথ।

মানুষের মধ্যে আল্লাহর অবস্থান

আল্লাহ আরশে আযীমে সমাসিন আছেন (সেজদা, ৪ আয়াত) এবং (ইউনুস, ৩ আয়াত)। আল্লাহ শুধু আরশেই সীমাবদ্ধ নয়। তার কুরসী আসমান ও জমিন ব্যাপ্ত। (বাকারা, ২৫৫ আয়াত) বরং তিনি সকল কিছুকে পরিবেষ্টন করে আছেন (নিসা, ১২৬ আয়াত) এবং (হামিম-সেজদা, ৫৪ আয়াত) এই আয়াতে মহিতুন শব্দ এসেছে। মহিতুন অর্থ পরিবেষ্টন করা। আরবি অভিধান পৃ. নং ৬২। আল্লাহর অবস্থান অতি নিকটে, (বাকারা, ১৮৬ আয়াত)। মানুষ এবং তার অন্তরের কাছাকাছি আল্লাহ অবস্থান করেন (আনফাল, ২৪ আয়াত)। এই আয়াতে হুলু শব্দ এসেছে, হুলু শব্দের অর্থ কাছাকাছি, আরবি অভিধান পৃ. ১২২১। আল্লাহ মানব সুরতে আহরণ করেছেন (ইনফিতর, ৮ আয়াত)। এই আয়াতে রাক্কাবাকা শব্দ এসেছে। রাক্কাবাকা শব্দের অর্থ আহরণ করেছে। আরবি অভিধান পৃ. ১৩৭৪। দিশারি অভিধান পৃ. ২০০। আল্লাহ মানুষকে পরিবেষ্টন করে আছেন, (বনি ইসলাইল, ৬০ আয়াত)। এই আয়াতে আহাত্বা শব্দ এসেছে। আহাত্বা শব্দের অর্থ পরিবেষ্টন করা, অভিধান পৃ. ৬২। আল্লাহ কাফিরদেরকে পরিবেষ্টন করে আছেন (বাকারা, ১৯ আয়াত)। আল্লাহ মানুষের দেহের মধ্যে অবস্থান করেন, এজন্য আল্লাহ বলেন, আমি মানুষের গর্দানের শাহা রগ হতে অতি নিকটে আছি (ক্বাফ, ১৬ আয়াত)। এখানে উল্লেখ্য যে, মানুষ এবং তার গর্দানের শাহা রগ উভয়ই মানব দেহের ভিতরে অবস্থান করে। আল্লাহ যখন সেই শাহা রগ অপেক্ষাও নিকটেÑ তাতে প্রমাণ হয় আল্লাহ মানুষের দেহের মধ্যেই অবস্থান করেন। আর একটি যুক্তি হচ্ছে, আল্লাহ মানুষের দেহের বাইরে এবং ভেতরে সমানভাবে অবস্থান করতে পারেন, তবে তিনি যখন মানুষের দেহের বাইরে অবস্থান করে কথা বলেন তখন আনা শব্দ ব্যবহার করেন। যেমনÑ মুসার সাথে তুর পাহাড়ে কথা বলেছিলেন, মুসার দেহের বাহিরে অবস্থান করেন। তাই সেই সময় আল্লাহ আনা শব্দ ব্যবহার করেছেন। অর্থাৎ আমিই আল্লাহ (ত্বাহা, ১৪ আয়াত)। পক্ষান্তরে আল্লাহর অবস্থান মানুষের দেহের মধ্যে যখন, তখন সেই অবস্থানকে নিশ্চিত বুঝানোর জন্য 'নাহনু' শব্দ ব্যবহার করেছেন। তাই ক্বাফের ১৬ আয়াতে নাহনু শব্দ এসেছে। নাহনু মানে আমরা। কারণ মানুষের মধ্যে একই দেহে আল্লাহ এবং মানুষ উভয়ে অবস্থান করছেন, তাই এখানে আল্লাহ নিজেকে আমি শব্দ ব্যবহার করলে মানব দেহের মধ্যে শুধু আল্লাহ অবস্থান করেন, এটা বুঝায়। সেক্ষেত্রে মানুষের অবস্থানটা অনুপস্থিত বুঝায়। তাই মানুষ এবং আল্লাহ উভয়ই মানব দেহের ভেতরে অবস্থান করছেন বিধায় এই আয়াতে আল্লাহ নিজে 'আমরা' শব্দ ব্যবহার করেছেন। তাই আল্লাহর অবস্থান মানব দেহের মধ্যে নিশ্চিত করার জন্য 'আমি' শব্দ ব্যবহার না করে 'আমরা' শব্দ ব্যবহার করেছেন। এই আয়াতে আমরা শব্দ দিয়ে যদি কেউ আল্লাহর বহুবচন প্রমাণ করে তা হবে না। কারণ আল্লাহ এক এবং অদ্বিতীয় (এখলাস, ১ আয়াত)। আর যদি কেউ বলেন, প্রত্যেক মানুষে যদি আল্লাহ থাকেন, তাহলে তো যত মানুষ তত আল্লাহ হয়ে যায়। কিন্তু না, তা নয়। বরং এক আল্লাহ সকল মানুষেই বিরাজ করেনÑ সমভাবে এটা আল্লাহর বিশেষ গুণ ও ক্ষমতা। যে বিশেষ গুণ ক্ষমতা আল্লাহ ইবলিশকে দান করেছে, সেই ক্ষমতা বলে ইবলিশ প্রত্যেক বনি আদমের মধ্যে বা সাথে আছে। কারণ জন্মসূত্রে ইবলিশ সকল বনি আদমের সাথে আছে (তাহা-১২৩)। আর যারা আল্লাহর স্মরণে গাফেল থাকে ইবশিল তাদের সঙ্গী হয়। (যুখরুফ-৩৬)। অতএব মানুষের মধ্যে ইবলিশ থাকার পরও ইবলিশ বলতে আমরা একজনকেই বুঝি। তদ্রুপ মানুষের মধ্যে আল্লাহর উপস্থিতি থাকার পরও আল্লাহ এক এটাও নিশ্চিত। এটাই হচ্ছে কোরআন মাফিক আল্লাহ বিশ্বাস।
উপরিউক্ত আয়াতগুলোতে প্রমাণ হয় যে, আল্লাহ সর্বত্রই তথা মানুষের মধ্যেও বিরাজমান। কিন্তু এই পর্যায়ে এসে এক শ্রেণির মানুষ তর্ক করে বলেন, এই সকল আয়াত দিয়ে আল্লাহ মানুষের ভিতরে অস্তিত্বগতভাবে আছেÑ এটা বুঝানো হয় নি। বরং জ্ঞানগতভাবে আছে বা ক্ষমতাগতÑ এটা বুঝানো হয়েছে। তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলছি, জ্ঞানগতভাবে বা ক্ষমতাগতভাবে আল্লাহ প্রত্যেক বস্তুতে আছে, এটা সঠিক, কিন্তু উপরিউক্ত আয়াত দিয়ে সেটা বুঝানো হয় নি। কারণ জ্ঞানগতভাবে বা ক্ষমতাগতভাবে আল্লাহ প্রত্যেক বস্তুতে আছেÑ এটা অন্য আয়াতে বলা হয়েছে। যেমনÑ আহযাব, ৪০ আয়াতে বলা হয়েছে, আল্লাহ সকল বস্তু সম্বন্ধে জ্ঞান রাখেন। এই আয়াতে আলিমুন শব্দ এসেছে, বিধায় আল্লাহ প্রত্যেক বস্তুতে জ্ঞানগতভাবে অবস্থান করছেন এটা বুঝানো হয়েছে। এবং আল্লাহ সকল কিছুর উপর ক্ষমতাবান (বারাকা, ১৪৮ আয়াত)। এই আয়াতে কাদিরুন শব্দ এসেছে, পক্ষান্তরে নেসার ১২৬ আয়াতে বলা হয়েছে, আল্লাহ সকল কিছুকে পরিবেষ্টন করে আছেন, এই আয়াতে মুহিতুন শব্দ এসেছে। দেখা যাচ্ছে, আল্লাহ পাকের অবস্থান বুঝাতে গিয়ে তিনটি আয়াতে তিনটি শব্দ এসেছে। একটা হচ্ছে আলিমুনের আয়াত ও কাদিরুনের একটি আয়াত, অপরটি হচ্ছে মুহিতুন-এর আয়াত। তিনটি আয়াত, তিনটি শব্দ এবং উদ্দেশ্যও তিনটি। যদি কেউ মুহিতুনের আয়াতটাকেও আলিমুন ও কাদিরুন অর্থে ব্যবহার করে, সেক্ষেত্রে মুহিতুনের আয়াতের উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয়। কিন্তু আল্লাহর কোনো আয়াতের উদ্দেশ্য ব্যর্থ করা যাবে না (হুদ, ২০ আয়াত)। তারপরও যদি কেউ আয়াতের উদ্দেশ্য ব্যর্থ করার চেষ্টা করে তবে তার জন্য কঠিন শাস্তি, জাহান্নাম (হজ, ৫১ আয়াত)। কাজেই আমরা সতর্ক হয়ে যাই, আল্লাহর অস্তিত্বগতভাবে প্রত্যেক বস্তুতে তথা প্রত্যেক মানুষে বিরাজ করছেন এটা নিশ্চিত করার জন্যই উপরিউক্ত আয়াতগুলো পবিত্র কোরআনে এসেছে। এই আয়াতগুলো দিয়েই মানুষের মধ্যে আল্লাহ পাক অস্তিত্বগতভাবে অবস্থান করেন, এটাও বিশ্বাস করতে হবে আবার জ্ঞানগতভাবে অবস্থান করেন, এটাও বিশ্বাস করতে হবে। উভয় ভাবেই আল্লাহকে বিশ্বাস করাই মমিনের পরিচয়। এখন দেখা যাচ্ছে মানুষের একই দেহে দুটি অস্তিত্ব বিদ্যমান। একটি হচ্ছে মানুষ, অপরটি হচ্ছে আল্লাহ। মানব সত্তাকে বলা হচ্ছে নফ্স, আর প্রত্যেক নফসের মৃত্যু হবে (আনকাবুত, ৫৭ আয়াত) এবং (আম্বিয়া, ৩৫ আয়াত) আর অপরটি হচ্ছে রুহ সত্তা। আর রুহু সত্তাই হচ্ছে প্রভু সত্তা (বনি ইসরাইল, ৮৫ আয়াত)। এই মর্মে আল্লাহ বলেন, আমি দুইটি দরিয়া পাশাপাশি প্রবাহিত করি, মাঝখানে একটি অবেধ্য অন্তরাল যা অনতিক্রম্য ব্যবধান (আররহমান, ১৯ আয়াত) এবং (ফুরকান, ৫৩ আয়াত)।
এখানে উল্লেখ্য যে, উপরিউক্ত আয়াতে একই মানব দেহে দুটি প্রবাহ, একটি হচ্ছে নফ্স, আর অপরটি রুহুকে বুঝানো হয়েছে। নফস্ এবং রুহের মাঝখানে একটি অনতিক্রম ব্যবধান রয়েছে, যার ফলে নফস্ কখনো তা অতিক্রম করতে সক্ষম হবে না বিধায় নফস কখনো রুহ সত্তার দাবিদার নয়। এটাই হচ্ছে আল্লাহর কৌশল, যে কৌশলে তিনি তাঁর সৃষ্টির সাথে অবস্থান করেন। আল্লাহ বলেন, তোমরা আল্লাহর কৌশলকে ভয় কর, তা না হলে তোমরা হবে ক্ষতিগ্রস্থ। (আরাফ-৯৯) তাই মানব যখন ঘুমায় তখন একটি সত্তা দেহের বাইরে অবস্থান করেন (যুমার, ৪২ আয়াত)। তখন নফস সত্তা দেহের বাইরে অবস্থান করে (ইসলামিক ফাউন্ডেশন-এর আল-কুরনুল কারিম-এর টিকা নং ১৫০১) মানব রসূলের মধ্যে আল্লাহ পাকের যে অবস্থান ছিল, সেই আল্লাহকেই আল্লাহ বলতে বলা হয়েছে (আলফাতহের ১০ আয়াত) বিধায়, মানব রসূলকে আল্লাহ সাব্যস্ত করা হয় নি বরং রসূল এর দেহের মধ্যে আল্লাহর সত্তা রুহের উপস্থিতি আছে, সে সত্তাকেই আল্লাহ বলা হয়েছে বিধায় রসূলের হাত আল্লাহর হাত বলা, রসূলকে আল্লাহ সাব্যস্ত করার শামিল হয় নি বিধায় রসূলের হাত, আল্লাহর হাত বিশ্বাস করা কখনো বাকারার ২২ আয়াতের পরিúন্থী হবে না। তারপরও যদি কেউ এমনটি বলেন, মানব রসূলের মধ্যে দুইটি স্বত্বা, কিন্তু দেহতো দুটি নয়, দেহ তো একটি, যেটি মানব দেহ। মানব আকৃতিতে যদি কেউ আল্লাহ স্বীকার করে, তাহলেতো মানব আকৃতিটা আল্লাহর উপমা হয়ে যায়। যা নহলের ৭৪ আয়াতের পরিপন্থী হয়। বিধায় এখানে উল্লেখ্য যে, এই আকৃতিটা মানুষের নিজস্ব আকৃতি নয়। কারণ মানব আকৃতিটা আল্লাহর সুন্দর আকৃতি ও প্রকৃতির অনুকরণে তৈরি (ত্বীন, ৪ আয়াত) এবং (রুম, ৩০ আয়াত)। যেহেতু আল্লাহর নিজ আকৃতির অনুকরণেই মানব তৈরি, সেহেতু মানব আকৃতির প্রকৃত মালিক হচ্ছে আল্লাহ। মানব হচ্ছে এই দেহ নামের ঘরে সাময়িক মেহমান। কাজেই মানব আকৃতি হচ্ছে আল্লাহর শায়ের। শায়ের অর্থ চি‎হ্ন‎‎ (আরবি অভিধান পৃ. ১৫৩০) মানব আকৃতি যেহেতু আল্লাহর নিজস্ব আকৃতির অনুকরণে তৈরি, এখানে উল্লেখ্য যে প্রত্যেক মানুষের চেহারা আল্লাহর নিজ চেহারা। কারণ পৃথিবীতে এক মানুষের চেহারার সাথে অবিকল আর একটি মানুষ নেই, এই জন্য আল্লাহর চেহারা এক এবং অভিন্ন এবং আল্লাহ যে এক এটা তারই নিদর্শন। সেহেতু মানব আকৃতিতে আল্লাহ বিশ্বাস করা আল্লাহর উপমা দেওয়ার শামিল হবেনা। আল্লাহ বলেন, শায়ের আল্লাহতে দৃষ্টি দেওয়া তো আল্লাহরই তাকওয়ার সঞ্জাত। (হজ, ৩২ আয়াত)। রসূল সুরত যেহেতু আল্লাহর শায়ের, সেহেতু রসূল সুরতে আল্লাহ বিশ্বাস করা, আল্লাহর উপমা দেওয়ার শামিল নয় বিধায় রসূলের হাত আল্লাহর হাত বিশ্বাস করা কখনো নহলের ৭৪ আয়াতের পরিপন্থি হবে না। বরং রসূলের হাত, আল্লাহর হাত বিশ্বাস করাই প্রকৃত মমিনের পরিচয়।
সম্যক গুরুগণই রসূল, সম্যক গুরুর সঙ্গ ধারণ করে আল্লাহ পাকের পরিচয় লাভ করাই মানব মুক্তির উপায়।

আল্লাহ সম্পর্কে দলিল ও কিতাববিহীনভাবে তর্ক করা যাবে না

আল্লাহ সম্পর্কে না জেনে কোনো কথা বলা যাবে না। আরাফ, ৩৩ আয়াত। আল্লাহ সম্পর্কে মিথ্যারোপ করা যাবে না। হুদ, ১৮ আয়াত। আল্লাহ সম্পর্কে দলিল ও কিতাব বিহীনভাবে তর্ক করা যাবে না। হজ ৮ আয়াত। আল্লাহর নিদর্শন সম্পর্কে দলিলবিহীন তর্ক করা যাবে না। (৪০ : ৩৫) অনেকেই আল্লাহ সম্পর্কে ধারণা কল্পনা বা অনুমান করে, কিন্তু সত্য সম্পর্কে ধারণা, কল্পনা ও অনুমান মোটেও ফলপ্রসু নহে। (ইউনুস-৩৬)। তাই ইব্রাহিম (আঃ) তাঁর পিতাকে বলেছিল, তোমার প্রভু সম্পর্কে তোমার ধারণা কি? (সাফফাত-৮৭) অর্থাৎ আল্লাহ সম্পর্কে কাল্পনিক ধারণা গ্রহনযোগ্য নহে। বরং কোরআন মাফিক আল্লাহ বিশ্বাস করতে হবে এটাই সঠিক।

আল্লাহ গায়েব নন

অনেকেই আল্লাহ সম্পর্কে তর্ক করে বলে, আল্লাহ গায়েব। কিন্তু আল্লাহকে গায়েব ভাবে বিশ্বাস করতে হবে এমন আয়াত পবিত্র কোরআনে নেই। তবে আল্লাহর কিছু গায়েব বিষয় আছে সেগুলো হচ্ছেÑ মৃত্যুর আযাব, মৃত্যুর পরের আযাব, হাশর ও জাহান্নামের আযাব ও জান্নাতের সুখ ইত্যাদি। এই গায়েব বিষয়গুলোকে বিশ্বাস করতে বলা হয়েছে। বাকারা, ৩ আয়াত। আল্লাহর গায়েব বিষয়গুলোকে ভয় করতে বলা হয়েছে। ইয়াসিন, ১১ আয়াত। তবে এই সকল আয়াত দিয়ে আল্লাহকে গায়েব প্রমাণ করা যাবে না। কারণ গায়েব শব্দের অর্থ অনুপস্থিত। ইউসুফ, ৫২ আয়াত। অভিধানের পৃ. ১৮৫২, অভিধান দিশারি পৃ. ১৭৮। যেহেতু গায়েব শব্দের অর্থ অনুপস্থিত আর আল্লাহ সকল বস্তুতে মহিতুনভাবে সর্বত্র বিরাজমান। নেছা, ১২৬ আয়াত। কাজেই আল্লাহ কখনো গায়েব নয়। তাছাড়া আরাফ ৭ আয়াতে উল্লেখ আছে, আল্লাহ গায়েব নয়। বিধায় আল্লাহকে কোনো অবস্থায় গায়েব বলা যাবে না। আল্লাহ গোপন ভাবে থাকতে পারেন (হাদিদ-৩)।

আল্লাহ লা-উরাই বা অদৃশ্য এমন আয়াত কোরআনে নেই

অনেকেই তর্ক করে বলে আল্লাহ গাইর মু-রাই বা লা-উরাই। রুয়াই শব্দের আভিধানিক অর্থ দেখা বা দৃশ্যমান, অভিধান পৃষ্ঠা ১৩৮৬, আবার গাইরু শব্দের আভিধানিক অর্থ ভিন্ন, ব্যতীত বা না-বোধক, অভিধান পৃ. ১৮৫২। আর লা শব্দের অর্থ না-বোধক। কাজেই গাইর মু-রাই বা লা-উরাই শব্দের অর্থ হচ্ছে অদৃশ্য বা অদেখা দিশারি অভিধান পৃ. ১৭৮। যেহেতু আল্লাহ গাইর মু-রাই বা আল্লাহ লা-উরাই এমন কোনো আয়াত পবিত্র কোরআনে নেই বিধায় আল্লাহকে গাউর মুরাই বা লা-উরাই বা অদৃশ্য বলব না। কাজেই বুঝা গেল আল্লাহ অদৃশ্য নয়।

আল্লাহর আকৃতি আছে ও তিনি প্রকাশ হতে সক্ষম

অনেকেই আল্লাহ সম্পর্কে তর্ক করে বলেন, আল্লাহর কোনো আকৃতি নেই। কিংবা আল্লাহ আকৃতি ধারণ করেন না। আল্লাহর কোনো আকৃতি বা চেহারা নেই এমন কোনো আয়াত পবিত্র কোরআনে নেই। বরং আল্লাহর আকৃতি বা চেহারা সম্পর্কে আয়াত আছে। সাদ, ৭৫ আয়াতে বলা হয়েছে, আল্লাহর হাত আছে। অনেকেই বলে আল্লাহর সেই হাত নাকি কুদরতি হাত, কিন্ত যে হাত আদমের দেহ তৈরীতে ব্যবহৃত যেহেতু আদমের দেহ মাটি দিয়ে তৈরী অর্থাৎ বাস্তব বস্তু দিয়ে তৈরী যে হাত দিয়ে আদমের দেহটা তৈরী সে হাতটা নিশ্চয়ই বাস্তব. আল্লাহ বলেন, আমি নিজ হাতে আদম তৈরি করেছি (সাদ-৭৫)। বিধায় আল্লাহর হাতটা বাস্তব। কালাম, ৪২ আয়াতে বলা হয়েছে, আল্লাহর পা আছে। আল্লাহর যে পা প্রকাশ হবে সে পা নিশ্চয়ই বাস্তব। সে দিন আল্লাহর পা প্রকাশ করা হবে (সূরা কালাম-৪২) এবং বাকারা, ১১৫ আয়াতে বলা হয়েছে, আল্লাহর চেহারা আছে। কাসাস, ৮৮ আয়াতে বলা হয়েছে, সকল কিছু ধ্বংস হবে আল্লাহ চেহারা ব্যতীত। অতএব যে চেহারা ধ্বংশ হবে না মর্মে উল্লেখ আসছে, তাতে প্রমাণ হয় আল্লাহর সেই চেহারাটা নিশ্চয়ই বাস্তব। ছয় দিনে পৃথিবী তৈয়ারি করে আল্লাহ আরশ আজীমে বসলেন। সেজদা, ৪ আয়াত। যেহেতু আল্লাহ আরশে বসলেন যেক্ষেত্রে দাঁড়ানো ও বসা উল্লেখ আসছে তাহলে অবশ্যই তাঁর ধড় বা দেহ আছে। এই সকল আয়াত বিশ্লেষণে জানা গেল, আল্লাহর আকৃতি আছে বা আল্লাহ আকৃতি ধারণ করে থাকেন। আর সেই দিন আল্লাহ আকৃতি ধারণ করেই প্রকাশ হবে। আর তাই সুরা
হাদিদ, ৩ আয়াতে বলা হয়েছে, আল্লাহ প্রকাশ্য বিদ্যমান। তাহলে দেখা যাচ্ছে আল্লাহ আকৃতিগতভাবে প্রকাশ হবে এটা নিশ্চিত।

ইহকালে আল্লাহর সাক্ষাত অসম্ভব এমন কথা কোরআনে নেই

অনেকেই আল্লাহ সম্পর্কে তর্ক করে বলে আল্লাহর সাথে মানুষের কোনো সাক্ষাৎ ঘটবে না। ইহকালে আল্লাহর সাক্ষাত অসম্ভব এমন কোনো আয়াত পবিত্র কোরআনে আসে নি। বরং আয়াতে আসছেÑ ইহকালে আল্লাহ তিন পদ্ধতিতে মানুষের সাথে কথা বলেন। (১) ওহীর মাধ্যমে (২) হিজাব বা ছদ্মবেশ ধারণ করে (৩) বিশেষ দূত প্রেরণ এর মাধ্যমে (সূরা- শুরা-৫১) "হে মানুষ তুমি কঠোর সাধনা করো অবশ্যই আল্লাহর সহিত সাক্ষাৎ ঘটবে।" ইনশিকাক, ৬ আয়াত। মোমেন নিশ্চিত জেনে রাখুক আল্লাহর সাক্ষাত লাভ করবে। হুদ, ২৯ আয়াত। যারা আল্লাহর সহিত সাক্ষাৎ কামনা করে তারা জেনে রাখুক; আল্লাহর সেই নির্ধারিত কাল অবশ্যই আসবে। আনকাবুত, ৫ আয়াত। যারা আল্লাহর সাক্ষাতের আশা পোষণ করে না তারা আল্লাহর নিদর্শন সম্পর্কে গাফেল। ইউনুস, ৭ আয়াত। আল্লাহ সাক্ষাতে যাতে মানুষ নিশ্চিত বিশ্বাসী হতে পারেন এই জন্য তার নিদর্শন স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করেন। রাদ, ২ আয়াত। যারা আল্লাহর সাক্ষাতের আশা পোষণ করে না তারা কোরআন ছাড়াও অন্য কিতাবকে দ্বীনের দলিল হিসেবে মনে করে। ইউনুস, ১৫ আয়াত। যারা আল্লাহর সাক্ষাৎ কামনা করে না তারা সীমালঙ্ঘনকারী। ফুরকান, ২১ আয়াত। যারা আল্লাহর সাক্ষাতের আশা পোষণ করে না তারা উ™£ান্ত। ইউনুস, ১১ আয়াত। এই জন্য আল্লাহ বলেন, তোমরা আমার সাক্ষাৎ সম্পর্কে সন্দেহ পোষণ করিও না। হামীম আস সেজদা, ৫৪ আয়াত। এই সকল আয়াত বিশ্লেষণে জানা গেল। আল্লাহর সাক্ষাৎ ঘটবে এটা নিশ্চিত। আর আল্লাহর সাক্ষাতের ব্যাপারে মানুষের কাছে আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি স্পষ্ট প্রমাণ অবশ্যই এসেছে। যারা তা দেখল তারা লাভবান হবে তবে যারা না দেখল তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আনআম, ১০৪ আয়াত।
এখন আমরা জানব সেই সাক্ষাৎটা কীভাবে কোন প্রক্রিয়ায় হবে। কারণ আমরা জানি আল্লাহর তাজাল্লি সৃষ্ট জগত সহ্য করতে পারবে না। কারণ আল্লাহর তাজাল্লি যখন পাহাড়ে অবতরণ করল তখন পাহাড় চূর্ণ বিচূর্ণ হলো এবং মুসা পড়ে গেল। আরাফ, ১৪৩ আয়াত। এই ঘটনায় আল্লাহ মুসাকে বুঝালেন যে হে মুসা তুমি যে আমাকে তাজাল্লিময় রূপে দেখতে চেয়েছ। তুমি আমাকে তাজাল্লিময়ভাবে কখনো দেখতে পাবে না। আরাফ, ১৪৩ আয়াত। এজন্য আল্লাহ বলেন, আমি মানুষের সাথে হিজাব ধারণ করে বা ছদ্মবেশ ধারণ করে কথা বলি। শুরা, ৫১ আয়াত। হিজাব অর্থ ছদ্মবেশ অভিধানের পৃ. ১১৪৯। মুসার সাথে তুর পাহাড়ে ছদ্মবেশ ধারণ করে কথা বলেছে। এ সময় আল্লাহ তুর পাহাড়ে অবস্থান করেছিল। ত্বাহা, ১২ আয়াত। মুসার সাথে আল্লাহ (ছদ্মবেশ ধারণ করে) সরাসরি বাক্যালাপ করেছেন; নেছা, ১৬৪ আয়াত। মুসার সাথে আল্লাহর সাক্ষাৎ ঘটেছিল সেজদার ২৩ আয়াত। আবার মোহাম্মদ (স.)-এর সাথে আল্লাহ নিজ আকৃতিতে দেখা দিয়েছিল। নাজম, ৬ আয়াত। মোহাম্মদ (স.) যা দেখেছে সে সম্পর্কে বিতর্ক করো না। নাজম, ১২ আয়াত। সে তার প্রভুর আকৃতিগত নিদর্শন দেখেছিল। নাজম, ১৮ আয়াত। মোহাম্মদ (স.) আল্লাহকে দেখিয়াছিল স্পষ্ট দিগন্তে। তাকভীর, ২৩ আয়াত। সে তাঁকে আরেকবার দেখেছিল সিদরাতুল মুন্তাহার নিকটে। নাজম, আয়াত ১৩ ও ১৪। এই ভাবে মুসা (আঃ) এবং মোহাম্মদ (সঃ) এর নিজ সুরতের ছদ্মবেশে আল্লাহকে দর্শন করেছেন এটা নিশ্চিত। (বি. দ্র. এই পুস্তকের মুসা (আঃ) আল্লাহ দর্শন অধ্যায়ে বিস্তারিত দেখুন)।

সেদিন আল্লাহ প্রকাশ হবে মানব সুরতে

এখন আমরা জানব যখন আল্লাহর সাক্ষাৎ দিবে তখন কোন আকৃতির ধারণ করবে এবং মুসা মোহাম্মদ (স.)-এর সঙ্গে আল্লাহ কোন সুরতের ছদ্মবেশ ধারণ করে দেখা দিয়েছিল। আল্লাহর সাক্ষাৎ হবে যখন বিশ্বাস করলাম তখন সেই আকৃতিটা অবশ্যই জানতে হবে। তা না হলে আল্লাহর আকৃতি সম্পর্কে একটা ধারণা কল্পনা বা অনুমান উদয় হবে। কারণ আল্লাহ সম্পর্কে ধারণা বা কল্পনা বা অনুমান গ্রহণযোগ্য নয়। ইউনুস, ৩৬ আয়াত। পবিত্র কোরআন থেকেই আমরা আল্লাহর আকৃতি সম্পর্কে জানব।
পূর্বে আমরা জেনেছি আল্লাহর আকৃতি আছে। আর সেই আকৃতি অবশ্যই অতি সুন্দর। আল্লাহর একটি আকৃতি আছে, যেমন সূরা সাদের ৭৫ নং আয়াতে উল্লেখ আছে, আল্লাহর হাত আছে। সূরা কালামের ৪২ নং আয়াতে উল্লেখ আছে- আল্লাহর পা আছে এবং সূরা কাসাছ এর ৮৮ নং আয়াতে উল্লেখ আছে, আল্লাহর চেহারা ধ্বংস হবে না এবং সূরা সেজদার ৪ নং আয়াতে উল্লেখ আছে, ৬ দিনে পৃথিবী তৈরি করে আল্লাহ আরশে আজীমে সমাসীন হলেন। যেখানে দাঁড়ানো এবং বসা উল্লেখ থাকে সেক্ষেত্রে অবশ্যই আল্লাহর একটি আকৃতি আছে বলে প্রতীয়মান হয়। আর আল্লাহর সেই আকৃতিটাই হচ্ছে অতি উত্তম আকৃতি। আর আদমকে সেই অতি উত্তম আকৃতিতেই তৈরি করা হয়েছে। (সূরা-তীন, আয়াত-৪নং এবং সূরা-মমিন, আয়াত ৬৪) এবং সূরা-রুমের ৩০ নং আয়াতে উল্লেখ আছে, আল্লাহর প্রকৃতি অনুসারেই মানুষ তৈরি। সূরা-ইনফিতর এর ৮ নং আয়াতে উল্লেখ আছে, আল্লাহ বলেন, 'আমি যেমন তেমন আকৃতিতে মানুষ তৈরি করেছি, এইজন্য যে, যেন ইচ্ছামতো ঐরূপে আহরণ করতে পারি।' এখানে উল্লেখ্য যে, এই আয়াতে 'আইয়ু' সূরত শব্দ এসেছে। আইয়ু শব্দের আপেক্ষিক অর্থ হচ্ছে যেমন তেমন (আরবি অভিধান পৃ. ৬৩৮) ইংরেজিতে 'অং ষরশব ধং' আইয়ু শব্দের সাথে যে শব্দ ব্যবহৃত হবে সেই শব্দের অর্থের সাথে আইয়ু শব্দের অর্থ নির্ভর করে, যেমন তুমি আমাকে যেমনটা ধাক্কা দিলে আমিও তোমাকে তেমনটা ধাক্কা দিলাম। এই আয়াতে আইয়ু সূরত শব্দ এসেছে বিধায় আল্লাহর যেমন সূরত, তেমন সূরতেই আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। এই আয়াতে 'রাক্কাবাকা' শব্দ এসেছে, 'রাক্কাবাকা' শব্দের অর্থ হচ্ছে আহরণ করা (আরবি অভিধান পৃ. ১৩৭৪)। যেন ইচ্ছামত আল্লাহ মানব রূপে আহরণ করতে পারে। আবার মানব রূপের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত করার পক্ষে আল্লাহ আদম সূরতের মধ্যে নিজ রুহ ফুৎকার করে সেখানে সেজদার হুকুম দিল। হিজর ২৯ আয়াত ও সাদ ৭২ আয়াত। যেহেতু সকল সেজদা একমাত্র আল্লাহর প্রাপ্য। (জিন্ন ১৮ আয়াত)। (৪১ ঃ ৩৭)। আর সেই সেজদা যখন আদম সুরতে করতে বলা হচ্ছে এতে প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহর আকৃতি যেমন তেমন আকৃতিতেই মানুষকে তৈরি করা হয়েছে। আবার মানব আকৃতিকে প্রাধান্য দেওয়ার জন্য আল্লাহ নির্দেশ দেন। প্রত্যেক সেজদায় তোমাদের চেহারা প্রতিষ্ঠিত কর। আরাফ ২৯ আয়াত। আবার আল্লাহ বলেন, আমি যদি কোনো ফেরেস্তাকে পাঠাতাম তাও তাকে মানব আকৃতিতেই পাঠাতাম। আনআম ৯ আয়াত। আবার মরিয়মের কাছে আল্লাহর নিজ রুহু পূর্ণমানব আকৃতি ধারণ করে প্রকাশিত হলো এবং কথা বলল। মরিয়ম ১৭ আয়াত।
উপরিউক্ত আয়াতগুলোকে বিবেচনা করলে জানা যায় যে, আল্লাহ যখনই প্রকাশ হবে তখনই মানব আকৃতিতেই প্রকাশ হবে। মানুষের মৃত্যুর পরে যখন আল্লাহর সাক্ষাৎ ঘটবে তখন মানব আকৃতি ধারণ করেই প্রকাশ হবেন এবং সাক্ষাৎ দিবেন।

সেদিনের তাৎক্ষণিক বিশ্বাস কবুল করা হবে না এবং সেদিন তারা আল্লাহর পায়ে সেজদাও দিতে পারবে না

মানুষকে যখন বলা হলো মানব আকৃতিতে আল্লাহর সাক্ষাতে বিশ্বাসী হও। তখন এক শ্রেণির মানুষেরা বলিল, আল্লাহ গায়েব নয়, এটা বিশ্বাস করলাম, আল্লাহ অদৃশ্য নয়, এটাও বিশ্বাস করলাম। আল্লাহর আকৃতি আছে এটাও বিশ্বাস করলাম, আল্লাহ আকৃতিগতভাবে প্রকাশ হবেন এটাও বিশ্বাস করলাম। মানুষের সাথে আল্লাহর সাক্ষাৎ ঘটবে এটাও বিশ্বাস করলাম। আল্লাহ নিজ প্রকৃতিতে মানুষ তৈরি করেছেন এটাও বিশ্বাস করলাম। আল্লাহর সেই সুন্দর আকৃতিতে মানব তৈরি এটাও বিশ্বাস করলাম। আল্লাহর রুহ মানব আকৃতিতে প্রকাশ হয়েছে এটাও বিশ্বাস করলাম। মুসার সাথে আল্লাহর সাক্ষাত হয়েছে এটাও বিশ্বাস করলাম। মোহাম্মদ (স.) আল্লাহর সাক্ষাত লাভ করেছে এটাও বিশ্বাস করলাম। মৃত্যুর পরে 'মানুষের' সাথে আল্লাহর সাক্ষাত হবে এটাও বিশ্বাস করলাম। কিন্তু সেদিন আল্লাহ মানব আকৃতি ধারণ করে সাক্ষাত দিবে এটা বিশ্বাস করতে পারছি না। কারণ মানব আকৃতিতে সেদিন আল্লাহ প্রকাশ হবে বিশ্বাস করলে, মানব আকৃতিতে আল্লাহ এটা বিশ্বাস করা লাগে আর এই বিশ্বাস করলেই আদম কাবায় সেজদা দেওয়া লাগে। কিন্তু আমরা আদম কাবায় সেজদা দেওয়া বৈধ মনে করি না। আর তাই আল্লাহকে প্রত্যক্ষ না করা পর্যন্ত, আল্লাহ যে মানব আকৃতিতে প্রকাশ হবে এটা বিশ্বাস করিব না। যে দিন আল্লাহ আসবেন সেই দিন আমরা আগে দেখে নিব যে আল্লাহর আকৃতি কেমন। যেমন আকৃতিতে সেদিন দেখিব তেমন আকৃতিই আল্লাহর তখন সেই আকৃতিতে আল্লাহকে বিশ্বাস করিব। তার আগে আমরা এখন তোমাদের কথায় মানব আকৃতিতে আল্লাহ এই কথা বিশ্বাস করতে পারছি না।
তাদের উদ্দেশ্যে আল্লাহ বলেন তোমরা প্রতিক্ষায় আছ তোমাদের কাছে আল্লাহ আসবে, যেদিন সত্যই আল্লাহ আসবে সেদিন তোমরা আল্লাহকে বিশ্বাস করবে। কিন্তু সেদিনের সেই তাৎক্ষণিক বিশ্বাস আনয়ন কবুল করা হবে না। কারণ তারা পূর্ব থেকে বিশ্বাস করে নি। আনআম ১৫৮ আয়াত। এই জন্য আল্লাহ সেই সকল মানুষকে সতর্ক করে বলেন সেই দিবস আসার পূর্বেই তোমরা আল্লাহর আহ্বানে সাড়া দাও। সূরা-শুরা, ৪৭ আয়াত। কারণ সেদিনের তাৎক্ষণিক বিশ্বাস কবুল করা হবে না। সেজদা ২৯ আয়াত। আর সেদিন তোমরা বিশ্বাস অনুসারে সেজদাও দিতে পারবে না। কালাম ৪২ আয়াত। যখন তারা নিরাপদ ছিল তখন তো তাদের বলা হয়েছিল সেজদা করিবার। (কালাম-৪৩)। ঠিক একই ভাবে ইবলিশকে আহবান করা হয়েছিল আদম কাবায় আল্লাহকে সেজদা করিতে (আরাফ-১১) (হিযর-২৯)। সেই সময় আদম কাবায় আল্লাজহকে সেজদা করে নাই (বাকারা-৩৪)। আর তাই আজ যারা দুনিয়াতে আদম কাবায় আল্লাহকে সেজদা না করে ইবলিশের অনুসারী ছিল তারা সেদিন আদম আকৃতি বিশিষ্ট (বি. দ্র. সেদিন আল্লাহ প্রকাশ হবে কোন ছুরতে অধ্যায়ে বিস্তারিত দেখুন) প্রকাশ্য আল্লাহর পায়ে সেজদা দিতে সক্ষম হবে না।

আল্লাহর সাক্ষাৎ অস্বীকারকারীর কর্মফল বিনষ্ট হবে এবং তাদের জন্য সেদিন ওজনের কোনো ব্যবস্থা থাকবে না

অধিকাংশ মানুষ আল্লাহর সাক্ষাতকে অস্বীকার করল। রুম আয়াত ৮। তাদেরকে সতর্ক করে আল্লাহ বলেন, যারা এই সাক্ষাতকে মিথ্যা বলেছে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আনআম ৩১ আয়াত।
যারা আল্লাহর সাক্ষাৎকে মিথ্যা সাব্যস্ত করেছে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ইউনুস ৪৫ আয়াত। যারা আল্লাহর সাক্ষাৎকে অস্বীকার করে তাদের কর্মফল বিনষ্ট হবে। কিয়ামতের দিন তাদের জন্য ওজনের কোনো ব্যবস্থা থাকিবে না। কাহফ ১০৫ আয়াত)। আল্লাহ বলেন যে, কেহ ইহকালে অন্ধ সে পরকালেও অন্ধ থাকিবে। (সুরা বনি ইসরাইল-৭২)। (সুরা তাহা-১২৪) কাজেই ইহকালেই সম্যক গুরুর সঙ্গ ধারণ করে আল্লাহর সাক্ষাৎ লাভ করা মানব মুক্তির একমাত্র পথ।

মানব আকৃতি বিশিষ্ট আল্লাহর পায়ে সেজদার মাধ্যমে মৃত্যুর পর ঈমান পরীক্ষা করা হবে

প্রত্যেক জীবের মৃত্যুর পর পুনঃজীবিত করে তাকে প্রভুর কাছে প্রত্যানিত করা হবে। সূরা-আনআম, আয়াত-৩৬)। (সূরা-সেজদা, আয়াত-১১)। সূরা-(আনআম, আয়াত-৬২)। তখন তার সম্মুখ থেকে সকল পর্দা উন্মোচিত হবে এবং তার দৃষ্টি প্রখর করা হবে (সূরা-কাফ, আয়াত-২২)। তখন প্রভুর দিকে সে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকবে (সূরা-কিয়াম, আয়াত-২৩)। সেদিন কাফিররাও স্পষ্টভাবে আল্লাহকে দেখতে পাবে। (সূরা-মরিয়ম, আয়াত-৩৮)। তখন বলা হবে মৃত্যুর পুর্বে তোমরা যা কিছু (দেখিতে) কামনা করতে আজ সব দেখলে তো? (সূরা-ইমরান, আয়াত-১৪৩)। তখন তারা বলবে আমরা সব দেখলাম এবং শুনলাম এবং প্রভুকে বিশ্বাসও করলাম। (সূরা-সেজদা, আয়াত-১২)। তখন বলা হবে তোমাদের আজকের বিশ্বাস কবুল করা হবে না (সূরা-(সেজদা, আয়াত-২৯)। তবে যারা পূর্ব থেকে (এহেন দেখে) বিশ্বাসী ছিল তাদেরটা বিশ্বাস কবুল করা হবে। (সূরা-আনআম, আয়াত-১৫৮)। তখন তারা আত্মপক্ষ সমর্থনে যুক্তি প্রদর্শন করবে। (সূরা-নাহল, আয়াত-১১১)। এবং বলবে হে প্রভু আমরাতো পূর্ব থেকেই বিশ্বাসী ছিলাম। (সূরা-সেজদা, আয়াত-১২)। তখন বলা হবে, তোমরা বিশ্বাসী ছিলে বললেই তোমাদেরকে ছেড়ে দেয়া হবে না ইমান পরীক্ষা না করে। (সূরা-আনকাবুত, আয়াত-২)। শুধু মৌখিক ইমান পরীক্ষা করবে না, বরং ইমান অনুসারে পূর্ব কর্ম পরীক্ষা করা হবে। (সূরা-ইউনুস, আয়াত-৩০)। আর এমন একটি কঠিন পরীক্ষা করা হবে, যে পরীক্ষায় কারা প্রকৃতপক্ষে ইবলিসের অনুসারী ছিল, তারা ধরা পড়বে। (সূরা-কালাম, আয়াত-৬)। আর সেই পরীক্ষাটি এমন একটি কঠিন পরীক্ষা হবে যে, সেথায় শুধু যালিমরাই আক্রান্ত হবেনা (বরং নামধারী, লেবাসধারী মমিনরাও আক্রান্ত হবে।) (সূরা-আনফাল, আয়াত-২৫)। আমরা নিশ্চিত যে সে দিন আল্লাহ পাক মানব আকৃতিতে উপস্থিত হবেন এবং সাক্ষাত দিবেন। তখন আল্লাহর পা উন্মোচন করা হবে এবং সেজদা দিতে বলা হবে। তারা সক্ষম হবে না। কালাম, ৪২ আয়াত। কারণ তারা দুনিয়তে আদম কাবায় আল্লাহকে সেজদা করে নাই।
তখন তারা আত্মপক্ষ সমর্থনে আবার যুক্তি প্রদর্শন করে বলবে। নাহল ১১১আয়াত। আমরা তো দুনিয়াতে আল্লাহকে সেজদা করেছি তাহলে আজ কেন আমরা সেজদা দিতে সক্ষম হতেছি না। তখন তাদের যুক্তি এই ভাবে খ-িত হবে যে, যেহেতু আসমান ও জমিনে যা কিছু আছে সকলেই আল্লাহকে সেজদা করে। রাদ ১৫ আয়াত। সেই আয়াত অনুসারে ইবলিসও আল্লাহকে সেজদাকারী তোমরাও আল্লাহকেই সেজদাকারী। তোমরা আল্লাহকে প্রভু বলো, ইবলিসও আল্লাহকেই প্রভু বলে। হিজর ৩৬ আয়াত। কিন্তু ইবলিস আদম কাবায় সেজদা না দিয়েই কাফির হয়ে গেছে। বাকারা ৩৪ আয়াত। তদ্রƒপ মানুষের মধ্যে অধিকাংশ মানুষ আল্লাহকেই প্রভু বলে এবং আল্লাহকে সেজদা করে। হজ ১৮ আয়াত।
কিন্তু তারা আদম কাবায় সেজদা করে না। ফলে তারা ইবলিসের অনুসারী কাফির হয়ে গেছে। এই জন্য আল্লাহ পূর্বেই তোমাদেরকে সতর্ক করেছে। কাফ ২৮ আয়াত। যে তোমরা আল্লাহর কাছে পরিপূর্ণভাবে আত্মসমর্পণ কর কিন্তু কোনো বিষয়ে ইবলিসের অনুসরণ করোও না। বাকারা ২০৮ আয়াত। তোমরা আল্লাহকে ইবলিসের কায়দায় সেজদা দিয়েছ ঠিক কিন্তু তোমাদের বলা হয়েছিল আদমের নিমিত্তে সেজদা কর আরাফ, আয়াত ১১। কিন্তু তোমরা তা কর নি বিধায় আজ এই আদম আকৃতি বিশিষ্ট প্রকাশ্য আল্লাহর পায়ে সেজদা দিতে সক্ষম হতেছ না। ইবলিস আদম কাবায় আল্লাহকে সেজদা করে নি বিধায় আজ ইবলিস এবং ইবলিসের অনুসারী কাফিরদের ইমান পরীক্ষা করার লক্ষ্যেই মানব আকৃতি বিশিষ্ট আল্লাহর পায়ে সেজদা করার ব্যবস্থা করা হয়েছে। তোমরা দুনিয়াতে আদম কাবায় সেজদা না দিয়ে ইবলিসের অনুসারী বলে প্রমাণিত বিধায় আজ আল্লাহর পায়ে সেজদা দিতে সক্ষম হচ্ছ না।
যখন তোমরা নিরাপদ ছিলে তখন তোমাদেরকে আহ্বান করা হয়েছিল এই সেজদা দিতে। তোমরা তখন এ সেজদা কর নি বিধায় আজ আল্লাহর পায়ে সেজদা করতে সক্ষম হচ্ছে না। কালাম, ৪৩ আয়াত। বর্তমানে এক শ্রেণীর মানুষ আছে তারা এই ঘটনা মিথ্যা প্রমাণ করার লক্ষে নিম্নলিখিতভাবে আত্মপক্ষ সমর্থন করে যুক্তি প্রদর্শন করে বলে। আদম কাবায় সেজদার হুকুম তো শুধু ফেরেস্তাদের জন্য ছিল। আমাদের জন্য ছিল না বিধায় আমরা ঐ সেজদা করি নি। তোমরা এমনটি তর্ক করবে বিধায় তোমাদেরকে পূর্বেই সতর্ক করা হয়েছিল যে, ইবলিস জিন জাতীয়। কাহফ, আয়াত-৫০। ইবলিস জিন হওয়া সত্ত্বেও যখন আদম কাবায় সেজদা না দিয়ে কাফের তাহলে ঐ সেজদা শুধু ফেরেস্তাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না বরং প্রত্যেকের জন্য ফরজ ছিল। তখন তারা বলে ফেরেস্তা ও জিনদের জন্য আদম কাবায় সেজদা ফরজ ছিল কিন্তু উহা আমাদের জন্য নয়। তোমরা এমনি ভাবে তর্ক করবে বিধায় তোমাদেরকে পূর্বেই সতর্ক করা হয়েছে। কাফ, আয়াত-২৮। ইউসুফকে সেজদা দিল ইউসুফের ১১ ভাই এবং পিতা মাতা। ইউসুফ, আয়াত-১০০।
তখন তারা বলে ওটা ছিল ইউসুফকে নবী হিসেবে সম্মান জনক সেজদা। আর ঐ সকল সেজদার আয়াতগুলো রহিত করা হয়েছে, তোমরা এমনি তর্ক করবে বিধায় তোমাদেরকে সতর্ক করার লক্ষ্যে পূর্বেই বলা হয়েছে যে, সম্মানজনক কোনো সেজদা নেই কারণ সকল সেজদা একমাত্র আল্লাহর জন্য। জিন, আয়াত ১৮। আর কোনো আয়াত রহিত কা হয় নি। বাকারা, আয়াত-১০৬। তখন তারা আত্মপক্ষ সমর্থন করে পুনরায় যুক্তি প্রদর্শন করে বলবে আদম কাবায় সেজদার বিধান আদম থেকে ইউসুফ পর্যন্ত চালু ছিল। তার পরের থেকে আদম কাবায় সেজদার বিধান নেই। কথাটা ঠিক নয় কারণ আল্লাহর বিধানের কোনো পরিবর্তন নেই। এই বিষয়ে আল্লাহ বলেন, হে মোহাম্মদ (স.) তোমর পূর্বে যে সকল রসূল ছিল তাদের ক্ষেত্রে যে নিয়ম চালু ছিল তোমার ক্ষেত্রে একই নিয়ম আমার নিয়মের কোনো পরিবর্তন নেই। বনী ইসলাইল আয়াত-৭৭। কাজেই আল্লাহ সে দিন বলবে, তোমরা নিরাপদ থাকা অবস্থায় প্রকাশ্য আল্লাহর পায়ে সেজদা দাও নি বিধায় আজ সেজদা দিতে সক্ষম হচ্ছ না। কালাম আয়াত-৪৩। তখন তারা বলবে হে প্রভু আমরা সব শুনলাম এবং দেখলাম আমাদেরকে পুনরায় প্রেরণ করা হোক আমরা এ কর্মটি করিব। সেজদা আয়াত-১২। আল্লাহ বলবেন না, তোমরা মৃত্যুর সময়ও এমনটি বলেছিলে, ২৩ মমিন আয়াত-৯৯। না, ইহা একটি উক্তি মাত্র। তোমাদেরকে পুনরায় পূর্ব অবস্থায় প্রেরণ করা হবে না। পরবর্তী পুনর্জীবিত হওয়ার দিন পর্যন্ত তোমাদের সম্মুখে বরযখ থাকবে। ২৩ মমিন আয়াত-১০০।
অতএব, পবিত্র কোরআন মোতাবেক মানব আকৃতি বিশিষ্ট আল্লাহ বিশ্বাস ব্যতিরেকে মানুষের জন্য মুক্তির কোনো পথ নেই। আর ইমান আনা এবং মুক্তির পথ কেবলমাত্র সম্যক গুরু তথা রসূল এর সঙ্গ ধারণ করে আল্লাহর পরিচয় লাভ করা।

আল্লাহর নিজ আকৃতিতে আদম তৈরি

আল্লাহর একটি আকৃতি আছে, যেমন সূরা সাদের ৭৫ নং আয়াতে উল্লেখ আছে, আল্লাহর হাত আছে, সূরা কালামের ৪২ নং আয়াতে উল্লেখ আছে- আল্লাহর পা আছে এবং সূরা কাসাছ এর ৮৮ নং আয়াতে উল্লেখ আছে, আল্লাহর চেহারা ধ্বংস হবে না এবং সূরা সেজদার ৪ নং আয়াতে উল্লেখ আছে, ৬ দিনে পৃথিবী তৈরি করে আল্লাহ আরশে আজীমে সমাসীন হলেন। যেখানে দাঁড়ানো এবং বসা উল্লেখ থাকে সেক্ষেত্রে অবশ্যই আল্লাহর একটি আকৃতি আছে বলে প্রতীয়মান হয়। আর আল্লাহর সেই আকৃতিটাই হচ্ছে অতি উত্তম আকৃতি। আল্লাহ বলেন, আদমকে অতি উত্তম আকৃতিতেই তৈরি করা হয়েছে। (সূরা-তীন, আয়াত-৪নং এবং সূরা-মমিন, আয়াত ৬৪) এবং সূরা-রুমের ৩০ নং আয়াতে উল্লেখ আছে, আল্লাহর প্রকৃতি অনুসারেই মানুষ তৈরি। সূরা-ইনফিতর এর ৮ নং আয়াতে উল্লেখ আছে, আল্লাহ বলেন, 'আমি যেমন তেমন আকৃতিতে মানুষ তৈরি করেছি, এইজন্য যে, যেন ইচ্ছামত ঐরূপে আহরণ করতে পারি।' এখানে উল্লেখ্য যে, এই আয়াতে 'আইয়ু' সূরত শব্দ এসেছে। আইয়ু শব্দের আপেক্ষিক অর্থ হচ্ছে যেমন তেমন (আরবি অভিধান পৃ. ৬৩৮) ইংরেজিতে 'অং ষরশব ধং' আইয়ু শব্দের সাথে যে শব্দ ব্যবহৃত হবে সেই শব্দের অর্থের সাথে আইয়ু শব্দের অর্থ নির্ভর করে, যেমন তুমি আমাকে যেমনটা ধাক্কা দিলে আমিও তোমাকে তেমনটা ধাক্কা দিলাম। এই আয়াতে আইয়ু সূরত শব্দ এসেছে বিধায় আল্লাহর যেমন সূরত, তেমন সূরতেই আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। এই আয়াতে 'রাক্কাবাকা' শব্দ এসেছে, 'রাক্কাবাকা' শব্দের অর্থ হচ্ছে আহরণ করা (আরবি অভিধান, পৃ. ১৩৭৪)। যেন ইচ্ছামত আল্লাহ মানব রূপে আহরণ করতে পারে। উপরিউক্ত আলোচনায় বুঝা যায় যে, আল্লাহ পাকের নিজ আকৃতি ও প্রকৃতি অনুসারে মানুষ তৈরি করেছে।

মুছা (আ.) ও মোহাম্মদ (সা.) স্বরূপে আল্লাহ দর্শন করেছেন

আল্লাহ বলেন, 'আমি মুসাকে কিতাব দিয়েছি, অতঃপর তার সাক্ষাতের বিষয়ে তুমি সন্দেহ করিও না।' (সূরা সেজদা, আয়াত-২৩)। আর এই সাক্ষাতটি ছিল মুসাকে কিতাব দেওয়ার সময় (ইসলামিক ফাউন্ডেশন- আল কুরআনুল কারিম এর অনুবাদ- টীকা-১৩৫৪)। এই আয়াত অনুসারে কিতাব দেওয়ার সময় মুসার সাথে যে আল্লাহর সাক্ষাৎ ঘটেছিল এটা নিশ্চিত। এখন আমরা জানব সেই সাক্ষাৎটি কোন প্রক্রিয়ায় ঘটেছিল। আমরা জানি, আল্লাহর তাজাল্লি সৃষ্ট জগৎ সহ্য করতে পারে না। কারণ আল্লাহর তাজাল্লি যখন পাহাড়ে অবতরণ করল তখন পাহাড় চূর্ণ বিচূর্ণ হইল এবং মুসা পড়ে গেল। (সূরা আরাফ, আয়াত-১৪৩)। এই আয়াতে প্রমাণ হয় যে, সৃষ্ট জগৎ তথা মানুষ কেউ আল্লাহর তাজাল্লি সহ্য করতে সক্ষম নয় বিধায় এই ঘটনা দিয়ে আল্লাহ মুসাকে জানালেন যে, তুমি যে আমাকে তাজাল্লিময় রূপে দেখতে চেয়েছ, তুমি আমাকে তাজাল্লিময় রূপে দেখতে পাবে না। (সূরা আরাফ, আয়াত-১৪৩)। তবে পাহাড়ের দিকে তাকাও, পাহাড় যদি স্থির থাকে তাহলে তুমি আমাকে দেখতে পাবে, (সূরা আরাফ, আয়াত-১৪৩)। এই আয়াত অনুসারে যদি কখনো আল্লাহ পাহাড়ে অবস্থান করার পরও পাহাড় স্থির থাকে তাহলে সেই অবস্থায় আল্লাহকে দেখা যাবে। যেহেতু মুসা আগুন দেখল এবং আগুনের মধ্য থেকে ঘোষণা হল, আগুনের মধ্যে এবং তার চতুষ্পার্শ্বে যারা আছে তারা ধন্য, (সূরা-নামল, আয়াত-৭, ৮)। এখানে দেখার কথা উল্লেখ আছে। আল্লাহ যখন পাহাড়ে অবস্থান করে বলল, হে মুসা তুমি জুতা খুলে আস, আমি আল্লাহ। (সূরা তাহা, আয়াত-১২ এবং ১৪)। যেহেতু পাহাড়ে আল্লাহ অবস্থান করার পরও পাহাড় স্থির ছিল তাতে প্রমাণিত হয় যে মুসা আল্লাহকে দেখেছিল। বিধায় মুসার সাথে আল্লাহর সাক্ষাৎ সম্বন্ধে সন্দেহ করতে আল্লাহ নিষেধ করেছেন। (সূরা-সেজদা, আয়াত- ২৩)। যেহেতু মুসার সাক্ষাতের বিষয়ে সন্দেহ করতে নিষেধ করেছেন, তাহলে অবশ্যই মুসা তুর পাহাড়ে আল্লাহকে দেখেছিল বলে প্রমাণিত হয়। তারপরও যখন মুসা পুনরায় "আল্লাহকে দেখতে চেয়েছিল" (সূরা-আরাফ, আয়াত-১৪৩)। এতেই প্রমাণ হয় যে, প্রথমে মুসা আল্লাহর ছদ্মবেশী রূপ দেখেছিল, অর্থাৎ একটি ছদ্মবেশ রূপ ধারণ করে মুসার সাথে আল্লাহ তুর পাহাড়ে কথা বলেছিল বিধায় প্রথমে পাহাড় ধ্বংস না হয়ে স্থির ছিল। এতে প্রমাণ হয় যে, মুসা প্রথমে আল্লাহকে তাজাল্লিময় রূপে দেখে নি। বরং একটি পরিচিতি রূপের হেযাব বা ছদ্মবেশ ধারণকৃত অবস্থায় আল্লাহকে দেখেছে, কারণ আল্লাহ ঐ সময় পাহাড়ে অবস্থান করার পরও যখন পাহাড় স্থির ছিল, তাতে প্রমাণ হয় যে, তখন আল্লাহর তাজাল্লি প্রকাশ পায় নি, কারণ তাজাল্লি প্রকাশ পেলেত পাহাড় ধ্বংস হতো। যেহেতু পাহাড় ধ্বংস হয় নি, স্থির ছিল তাতে প্রমাণ হয় ঐসময় মুসা একটি পরিচিতি রূপের হেযাব বা ছদ্মবেশ ধারণকৃত অবস্থায় আল্লাহকে দেখেছে।
উপরিউক্ত আলোচনায় প্রতীয়মান হয় যে, তুর পাহাড়ে আল্লাহ একটি রূপের হেযাব বা ছদ্মবেশ ধারণ করে মুসার সাথে সাক্ষাত দিয়েছেন এবং সরাসরি বাক্যালাপ করেছেন, অর্থাৎ মুসা আল্লাহকে দেখেছে কিন্তু তাজাল্লিময় রূপে নয়, বরং এমন একটি রূপের ছদ্মবেশ ধারণকৃত অবস্থায়, যে ছদ্মবেশটি ইবলিস ধারণ করতে সক্ষম নয়। এই মর্মে আল্লাহ বলেন, আমি মানুষের সাথে হেযাব বা ছদ্মবেশ ধারণ করেই কথা বলি। (সূর-শুরা, আয়াত-৫১)। এই আয়াতে হেযাব শব্দ এসেছে, হেযাব শব্দের আভিধানিক অর্থ ছদ্মবেশ (আরবি অভিধান পৃ. ১১৪৯)। অনেকেই বলে তুর পাহাড়ে আল্লাহ মূসার সাথে পর্দার আড়াল থেকে কথা বলেছেন। তাদের এই কথা ঠিক নহে। কারণ পর্দা রেখে কথা বললে। ইবলিস পর্দার অপর পার্শে¦ থেকে মূসাকে আল্লাহ সম্পর্কে প্রবঞ্চনা দিতে সক্ষম হয়ে যায়। তাছাড়া আল্লাহ পর্দা রেখে মানুষের সাথে কথা বলেন। কথাটা ঠিক নয় এজন্য যে, আল্লাহকে পর্দা করা অসম্ভব। কারণ আল্লাহকে পর্দা করার মত পর্দা আল্লাহ সৃষ্টিকুলে নেই। তা ছাড়াও আল্লাহকে পর্দা করলে পর্দার এক পাশে আল্লাহ অপর পাশে আল্লাহ অনুপস্থিত প্রমাণিত হয়। কিন্তু না, আল্লাহ কোথাও অনুপস্থিত নহে। (সূরা আরাফ : ৭) তা ছাড়াও আল্লাহ সর্বস্তরে মহিতুনভাবে সর্বত্র বিরাজমান। নেছার ১২৬ আয়াত। কাজেই আল্লাহকে পর্দা করা সম্ভব নয়। বিধায় আল্লাহ মানুষের সাথে কথা বলার সময় পর্দা রেখে কথা বলে এমন বুঝ ঠিক নয়। বরং আল্লাহ মানুষের সাথে হিজাব ধারণ বা ছদ্মবেশ ধারণ করে কথা বলে। এটাই সঠিক বুঝ। এখানে উল্লেখ্য যে, হেযাব শব্দের অর্থ পর্দা হবে তখনি যখন কথাটা সৃষ্ট দুই বস্তুর মধ্যে সংঘটিত হবে। কিন্তু হিযাব শব্দ যখন আল্লাহর সাথে হবে তখন হিযাব অর্থ ছদ্মবেশ অর্থ করতে হবে। হিজাব অর্থ ছদ্মবেশ, আরবি অভিধান পৃষ্ঠা ১১৪৯। কারণ আল্লাহকে পর্দা করা অসম্ভব। তার পরও অনেকেই বলেন, মুসা আল্লাহকে দেখে নি, তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলছি, যেহেতু মুসা আগুন দেখল এবং আগুনের মধ্য থেকে ঘোষণা হলো, 'আমিই আল্লাহ' (সূরা-নামল, আয়াত-৭, ৮ ও ৯ )। মুসা যেহেতু আগুন দেখিল এবং আগুনের মধ্য থেকে ঘোষণা হলো 'আমিই আল্লাহ' তাতে প্রমাণ হয় মুসা আল্লাহকে দেখেছিল। এই মর্মে আল্লাহ বলেন, "আমি মুসার সাথে সরাসরি সাক্ষাৎ বা বাক্যালাপ করেছি" (সূরা-নেসা, আয়াত-১৬৪)। তুর পাহাড়ে আল্লাহ মুসার অতি নিকট থেকে কথা বলেছেন। (সূরা-মরিয়ম, আয়াত-৫২)। ঐ সময় শ্রবণযোগ্য দূরত্বে অবস্থান করে আল্লাহ মুসার সাথে কথা বলেছিল এ বিষয়ে আল্লাহ বলেন, হে মুসা তুমি ওহী শ্রবণ কর। (সূরা-তাহা, আয়াত-১৩)। যেহেতু ওহী শ্রবণ করতে বলা হয়েছে তাহলে সেটা অবশ্যই, দেহের বাইরের আর একটি অবয়ব থেকে বলা হয়েছে এটা নিশ্চিত।
উপরিউক্ত আলোচনায় প্রতীয়মান হয় যে, মুসা আল্লাহকে তাজাল্লিময় রূপে দেখেনি, কথা সত্য, কিন্তু ছদ্মবেশ ধারণকৃত অবস্থায় তুর পাহাড়ে আল্লাহকে দেখেছে এটা সত্য। এখন আমরা জানব কোনরূপের ছদ্মবেশ ধারণ করে আল্লাহ মুসার সাথে দেখা দিয়েছিলেন এবং কথা বলেছিলেন। অনেকেই বলেন, আগুনের মধ্যে আকৃতিহীনভাবে দৈববাণীতে আল্লাহ্ মূসার সাথে কথা বলেছেন। আগুনের মধ্যে থেকে যদি আল্লাহ আকৃতিহীনভাবে দৈববাণীতে মুসার সাথে সেদিন তুর পাহাড়ে কথা বলে থাকেন, তাহলে পরক্ষণে ইবলিস মুসাকে আগুনের মধ্য থেকে আকৃতিহীনভাবে দৈববাণীতে কথা বলার মাধ্যমে আল্লাহ সম্পর্কে প্রবঞ্চনা দিয়ে মুসার কিতাবের মধ্যে ইবলিসের কথার অনুপ্রবেশ ঘটাতে সক্ষম হয়ে যায়। কারণ ইবলিসতো মূলতঃ আগুনেরই তৈরি। (সূরা-আরাফ, আয়াত-১২)। কাজেই আগুনের মধ্য থেকে ইবলিস আকৃতিহীনভাবে দৈববাণীতে কথা বলতে সক্ষম। আর ইবলিস বিভিন্ন ভাবে মানুষকে আল্লাহ সম্পর্কে প্রবঞ্চনা দিতে সক্ষম। (সূরা-লোকমান, আয়াত-৩৩ এবং সূরা-ফাতির, আয়াত-৫)। কাজেই ইবলিসকে প্রতিহত করার লক্ষে আগুনের মধ্যে নিশ্চয় একটা পরিচিতি রূপের ছদ্মবেশ ধারণ করে আল্লাহ কথা বলেছেন এটা নিশ্চিত। যেহেতু আল্লাহর তাজাল্লি মানুষ সহ্য করতে পারবে না বিধায় মানুষের সাথে আল্লাহ কথা বলার সময় নিম্নলিখিত ৩টি পদ্ধতি ছাড়া কথা বলেন না ঃ (১) ওহীর মাধ্যম ব্যতীত (২) হিযাব ধারণ বা ছদ্মবেশ ধারণ ব্যতীত, (৩) বিশেষ দূত অর্থাৎ ফেরেস্তা রসূল প্রেরণ ব্যতীত। (সূরা-শুরা, আয়াত-৫১)। উপরিউক্ত তিন পদ্ধতি ব্যতীত অন্য কোনো প্রক্রিয়ায় যদি আল্লাহ কোনো মানুষের সাথে কথা বলেন, তাহলে সূরা-শুরা, আয়াত-৫১টি ব্যর্থ হয়। কিন্তু না, আল্লাহর আয়াতকে ব্যর্থ করার মতো বুঝ বা দর্শন গ্রহণযোগ্য নয় বিধায় আকৃতিহীনভাবে আল্লাহ মুসার সাথে কথা বলেছেন এমন বুঝ পরিহারযোগ্য। কারণ এই আয়াতে আকৃতিহীনভাবে আল্লাহ কথা বলবে এমন কথা উল্লেখ নি। এখন আমরা জানব সেই ছদ্মবেশী অবয়বটির আকৃতি কেমন ছিল? অর্থাৎ কোন সুরতের ছদ্মবেশ ধারণ করে আল্লাহ মুসার সাথে কথা বলেছিল। এই প্রসংগে আয়াতে আসছে, তুর পাহাড়ের দক্ষিণ পার্শ্ব হতে একটি গাছ হতে মুসা আল্লাহর কথা শ্রবণ করল। (সূরা-কাসাছ, আয়াত-৩০)। অনেকেই মনে করতে পারেন যে, হয়ত গাছের মধ্য থেকে আল্লাহ কথা বলেছেন, সেক্ষেত্রে আল্লাহ গাছের ছদ্মবেশ ধারণ করেছে বলে প্রমাণ হয়। কিন্তু না, গাছের মধ্য থেকে গাছের ছদ্মবেশ ধারণ করে কথা বলেন নি। কারণ এই যে, যদি এমনটি হতো তাহলে আয়াতে ফি-সাজারাতু (অর্থ গাছের মধ্যে) কথা আসত কিন্ত আয়াতে এসেছে মিন সাজারাতু (অর্থ গাছ হতে), এতে প্রমাণ হয় যে, আল্লাহর ছদ্মবেশী সুরতটা নিশ্চয়ই গাছ ছিল না, বরং অন্য রূপের ছদ্মবেশ ধারণ করে গাছের দিক হতে কথা বলেছিলেন, এটাই গ্রহণযোগ্য। যেমনভাবে মোহাম্মদ (সা.) আল্লাহকে দেখেছিলেন প্রান্তবর্তী বদরী বৃক্ষের নিকটে (নাজম, আয়াত ১৩ ও ১৪) তাছাড়া গাছের ছদ্মবেশ ধারণ করে কথা বললে ইবলিসের অনুপ্রবেশ ঘটার আশংকা থেকে যায়। কারণ ইবলিস গাছে আহরণ করে কথা বলতে সক্ষম।
এখানে উল্লেখ্য যে, যদি কেউ এমনটি বলেন যে, ইবলিস তুর পাহাড়ে প্রবেশ করতে সক্ষম নয়, বিধায় ইবলিস মুসাকে আল্লাহ সম্পর্কে প্ররোচনা করার প্রশ্নই আসেনা। তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলছি, ইবিলিশ তুর পাহাড়ে যেতে পারবে না মর্মে কোনো আয়াত পবিত্র কোরআনে আসে নি বরং ইবলিস সকল অবস্থায় মানুষকে আল্লাহ সম্পর্কে প্রবঞ্চনা দেওয়ার ক্ষমতা রাখে (সূরা-লোকমান, আয়াত-৩৩) যেহেতু ইবলিস জিন জাতীয় (সূরা ক্বাফ, আয়াত-৫০) আর জিন যে কোনো সুরত ধারণ করে প্রকাশ হতে পারে কারণ সোলায়মান (আ.) এর সামনে জিন দ-ায়মান হয়েছিল, (সূরা নামল, আয়ত-১৭) যেহেতু জিন সোলাইমান (আ.) এর সামনে দন্ডায়মান হতে সক্ষম, তাহলে অবশ্যই মুসার সামনেও উপস্থিত হতে পারবে, এটাও নিশ্চিত। আর জিন মানুষকে পথভ্রষ্ট করে (৪১ নং সূরা হা-মীম আয়ত নং-২৯)। তারপরও যদি কেউ বলেন যে, আল্লাহ নিজ ক্ষমতা বলে মুসাকে ইবলিসের প্রবঞ্চনা থেকে নিরাপদ রেখেছিল, সেক্ষেত্রে অন্যরা যারা ইবলিসের প্রবঞ্চনা দ্বারা আক্রান্ত, তাদের ক্ষেত্রেও আল্লাহর নিজ ক্ষমতা বলে ইবলিসের প্রবঞ্চনা থেকে তাদেরকে রক্ষা করা আল্লাহর জন্য জরুরি হয়ে যায়। সেক্ষেত্রে যদি আল্লাহ ইচ্ছাকৃতভাবে এমনটি না করেন, অর্থাৎ ইবলিসের প্রবঞ্চনা থেকে মানুষকে রক্ষা না করেন তাহলে বিচার ব্যবস্থার ক্ষেত্রে আল্লাহর নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। যে বুঝ আল্লাহকে প্রশ্নবিদ্ধ করে সেই বুঝ পবিত্র কুরআন পরিপন্থী। আর কোরআন পরিপন্থি বুঝ পরিহারযোগ্য।


পবিত্র কোরআন থেকে বিষয়ভিত্তিক আলোচনা

করবী প্রকাশন
২৬ বাংলাবাজার, ঢাকা-১১০০

তৃতীয় সংস্করণ • জুলাই ২০১৪
দ্বিতীয় সংস্করণ • আগস্ট ২০১৩
প্রথম প্রকাশ • ফেব্রুয়ারি ২০১৩

প্রচ্ছদ • নাসিম আহমেদ

একমাত্র পরিবেশক • র‌্যামন পাবলিশার্স
২৬ বাংলা বাজার, ঢাকা, ফোন : ৯৫১৫২২৮

কম্পোজ :
মেঘদূত, বেজমেন্ট রুম # ৫৯-৬০, কনকর্ড এ্যাম্পোরিয়াম শপিং কমপ্লেক্স
২৫৩-২৫৪ এলিফ্যান্ট রোড, কাঁটাবন, ঢাকা-১২০৫

মুদ্রণ : মৌমিতা প্রিন্টার্স
২৫ প্যারীদাস রোড, ঢাকা-১১০০

মূল্য : ১৬০ টাকা মাত্র

ISBN 984-70740-0045-8

উৎসর্গ
আমার গুরু হযরত খাজা নিজামউদ্দিন আহমেদ চিশতী
মাহিদিয়া যশোহর-এর করকমলে